শিরোনাম: স্থানীয় ভাষায় অনুবাদের সমস্যা: ‘লোকালাইজেশন’ বা স্থানীয়করণে ইচ্ছুক নতুন ব্র্যান্ডগুলির জন্য কিছু কথা

Written by: Subhabrataa Biswas

বিভিন্ন ভাষা যদি কোনও গল্পের কাল্পনিক চরিত্র হয়, তাহলে ইংরেজিকে অনায়াসে কল্পনা করা যায় শিষ্টাচার জানা সহকর্মীর বেশে, যার সাথে এক টেবিলে বসে কাজ করলেও, প্রাণখুলে আড্ডা-রসিকতা, সুখ-দুঃখের ভাগীদার একমাত্র মাতৃভাষারূপী বন্ধুই হয়ে উঠতে পারে। ব্র্যান্ডগুলি তাদের গ্রাহকদের সেই ‘কাছের বন্ধু’ হওয়ার চেষ্টা অনবরত চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু বার্তা নয়, বরং ভাষার মাধ্যমে মানুষের মনের কাছাকাছি পৌঁছানোই এখন তাদের লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। তাতে যদি ব্যাপক সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছাতে বহু ভাষার আশ্রয় নিতে হয়, তবে তাই হোক!

বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি কীভাবে গ্রাহক ধরে রাখছে সেই চিত্রটাও স্থানীয়করণের প্রভাবে দ্রুত পাল্টাচ্ছে। গণমাধ্যমের কল্যাণে যে কোনও বার্তা এখন নিমেষের মধ্যে বহুসংখ্যক মানুষের হাতের মুঠোয় চলে আসছে। গ্রাহকদের সাথে যে কোনও আদানপ্রদানের সময় ব্যক্তিগত ছোঁয়া আনার বা গ্রাহকের নিজের ভাষায় বার্তা পৌঁছে দেওয়াকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শুধুমাত্র যে সুন্দরভাবে কথা বলার জন্য এটা করা হচ্ছে এমনটা নয়। এই বিষয়টা আসলে এখন প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে। বাজারে প্রতিযোগিতা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। মার্কেট শেয়ারও কমে যাচ্ছে। নিজেকে আলাদাভাবে তুলে ধরা ভীষণ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এইধরনের ব্যবসায়িক পরিবেশে, স্থানীয় ভাষায় নিজেদের বার্তা পৌঁছানোর মাধ্যমে বাজারে টিকে থাকা এবং নিজের ব্র্যান্ডকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র করে তোলা সম্ভব। কিন্তু এটা ভাবা যতটা সহজ, করা ঠিক ততই কঠিন। আঞ্চলিক ভাষায় আত্মপ্রকাশের জন্য ব্র্যান্ডগুলোকে আসলে কী কী সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে? বিভিন্ন ব্র্যান্ড এবং ভাষা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমাদের বিগত বেশ কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, মূলত এই পাঁচটি বিষয়ে সমস্যা হতে পারে।

1. ভাষান্তরিত করতে গিয়ে মূল বার্তাটিই হারিয়ে ফেলা

লোকালাইজেশন বা স্থানীয়করণ কিন্তু একেবারে নতুন কিছু নয়। অনেক কাল আগে থেকেই মিডিয়া ও পাবলিশিং ইন্ডাস্ট্রিগুলি বিভিন্ন ভাষায় কন্টেন্ট তৈরি করে এসেছে। তবে, তাদের কাজকর্ম মূলত কন্টেন্ট নিয়েই, তাই অনুবাদ ও লোকালাইজেশনের খুঁটিনাটি তাদের নখদর্পণে। ঠিক এই জায়গাতেই অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছে আঞ্চলিক ভাষায় কাজ করতে চলা নতুন ব্র্যান্ডগুলি, যাদের ভাষাগত অভিজ্ঞতা ঠিক ততটাও নেই, কিন্তু অভিজ্ঞতা থাকাটা স্থানীয়করণের জন্য একান্ত জরুরি। স্বাভাবিক ভাবেই, যেকোনও প্রতিষ্ঠানের মুখ্য আধিকারিকদের এই বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে বেশ দোটানায় পড়তে হয়। এছাড়াও, আঞ্চলিক ভাষায় প্রকাশের ফলে নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের বক্তব্য বা মন্তব্যের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোও সম্ভব। অন্য ভাষা না বুঝে তারা কীভাবে নিশ্চিত হবেন যে তাদের ব্র্যান্ডের মূল বার্তাটি অন্যান্য ভাষায় ঠিক সেভাবেই প্রকাশ হচ্ছে যেভাবে তারা চান? এইসব টানাপোড়েনের জন্যই অনেক কোম্পানি সহজ রাস্তাতেই হাঁটতে পছন্দ করে। যে কোম্পানিগুলি এই সমস্ত সমস্যা কাটিয়ে, সঠিক পার্টনার বেছে কোম্পানির মূল্যবোধগুলি আঞ্চলিক ভাষায় প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তারাই সাফল্যের শিখরে পৌঁছায়।

2. প্রাধান্যের মারপ্যাঁচ

প্রত্যেকটি ব্র্যান্ড গ্রাহক ধরে রাখার জন্য নিজস্ব কিছু বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে লোকালাইজেশন করার জন্য ব্র্যান্ডগুলোর কাছে সেই ইচ্ছে বা যাবতীয় সুযোগ সুবিধা থাকে না। ফলস্বরূপ, লোকালাইজেশন কোথা থেকে শুরু করতে হবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই প্রশ্নের সমাধান খুব সহজ। ব্র্যান্ডগুলিকে ভাষাগত অভিজ্ঞতার দিক দিয়ে এমন প্রতিটি বিষয় খুঁটিয়ে দেখতে হবে যেগুলি গ্রাহকদের ধরে রাখার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ। এটাও বুঝতে হবে যে কোন কোন ক্ষেত্রে তার প্রভাব সবথেকে বেশি হবে। যে অভিজ্ঞতাগুলি চোখে পড়ার মতো, সেগুলিতে জোর দিলে প্রভাবও বেশি পড়বে তা বলাই বাহুল্য। এটি কোনও বিজ্ঞাপন, ওয়েবসাইটের ল্যান্ডিং পেজ বা যেকোনও প্রোডাক্টের ইন্টারফেসও হতে পারে। এইধরনের টাচ পয়েন্টগুলি গ্রাহকদের বেশি আকৃষ্ট করে এবং তারা ধীরে ধীরে নিজস্ব ভাষায় আরও বেশি অভিজ্ঞতা পেতে চায়। এভাবেই, আঞ্চলিক ভাষায় কাজ করার জন্য দারুণ স্ট্র্যাটেজি দিয়ে শুরু করে যতক্ষণ না সম্পূর্ণ কন্টেন্টটি কোনও আঞ্চলিক ভাষায় পুরোপুরি বদলে দেওয়া যাচ্ছে ততক্ষণ এই কর্মপন্থায় অবলম্বন করতে হবে। একইরকমভাবে, মার্কেটের অবস্থা বুঝে কোন কোন ভাষাকে লোকালাইজেশনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিলে সুবিধা হয় তা বোঝাও সম্ভব হবে।

3. সঠিক পার্টনার বেছে নেওয়া

সব ব্র্যান্ডের কাছে যে ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে পারদর্শী বা অভিজ্ঞ টিম থাকবেই এমনটা সম্ভব নয়। আঞ্চলিক ভাষায় নিজেদেরকে তুলে ধরার স্ট্র্যাটেজি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত করতে গেলে সঠিক পার্টনার বেছে নেওয়াটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা অনেক ভেবেচিন্তেই ‘পার্টনার’ শব্দটি চয়ন করেছি, কারণ লক্ষ্যে পৌঁছাতে গেলে একজন সঠিক পার্টনার হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা খুবই জরুরি। কোনও ভালো ব্র্যান্ডের অবশ্যই এমন কোনও এজেন্সির সাথে পার্টনারশিপ করা উচিত যারা তাদের লক্ষ্য ও মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতন এবং সেগুলি খুবই যত্নসহকারে তুলে ধরতে সচেষ্ট। এমন একটি এজেন্সিকে সঠিক ট্রেনিং দিয়ে ব্র্যান্ডের নিজের মতো করে গড়ে তোলা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সহজ। যেকোনও ক্ষেত্রে সমান দায়িত্ববোধ থাকলে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও সফল হওয়ার তাগিদ অনেকটা বেড়ে যায়। কিন্তু সম্পর্ক যদি শুধুই লেনদেনের হয় তাহলে এই সাফল্য পেতে সমস্যা হবে!

4. ‘লোকালাইজেশন’ বা স্থানীয়করণ এবং অনুবাদের মধ্যে পার্থক্য বোঝা

এই বাক্যটি নিয়ে একটু ভাবা যাক। There is no set rule that a well-set brand should rule a market like a monopoly. In fact there is a thumb rule that states that any brand that tries to do so will only fall like a set of cards. এই বাক্যটিতেset’ এবংruleএমন দুটি শব্দ যা তিনটি জায়গায় তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে। কোনও অনুবাদক, যিনি মূল বাক্যটি থেকে আঞ্চলিক ভাষায় শব্দের পর শব্দ এক এক করে অনুবাদ করে চলেছেন, এক্ষেত্রে তার ভুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই বেশি থেকে যায়। অন্যদিকে, লোকালাইজেশন বা স্থানীয়করণে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি বাক্যের সম্পূর্ণ নির্যাসটুকু বুঝে নিয়ে নিজের ভাষায় সঠিকভাবে উপস্থাপিত করবেন। ভাষা আসলে একটি মজার জিনিস। ভাষায় ভুল হলে ব্যাপারটা হাস্যকর হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাইরের জগতের কাছে জিনিসটা মজার বা হাস্যকর হলেও কোনও ব্র্যান্ডের কাছে কিন্তু তা অত্যন্ত লজ্জাজনক হয়ে দাঁড়ায়। মনে রাখতে হবে যে লোকালাইজেশন হল এমন একটি বিষয় যেখানে মেশিন এখনও মানুষের দক্ষতাকে টেক্কা দিয়ে উঠতে পারেনি। তাই অনুবাদের আকর্ষণকে দূরে সরিয়ে লোকালাইজেশনের পথে পা বাড়ানোই শ্রেয়। প্রসঙ্গ বুঝে লোকালাইজেশন করা এখন বেশি দরকারি।

5. গুণমান ও দক্ষতা অর্জন

নিজেদের দক্ষতাকে প্রতিনিয়ত আরও ভালো করার প্রচেষ্টাই সফল ব্যবসার লক্ষণ। নিজেদের ভুল থেকে শেখা, সুযোগের সদ্ব্যবহার করা, কাজের প্রক্রিয়া সহজ করে তোলা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে লক্ষ্য রাখা সবসময় প্রয়োজন। প্রযুক্তির সুবাদে লোকালাইজেশন ইন্ডাস্ট্রি এখন কম্পিউটার এডেড ট্রান্সলেশন (CAT) টুলের দ্বারা ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে। ভাষার মধ্যে যেমন শিল্প আছে, ঠিক তেমনই লোকালাইজেশনের পেছনে রয়েছে বিজ্ঞান। এটি যেকোনও ভাষায় ভাবপ্রকাশের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুযোগ দেয়। যেসব নতুন ব্র্যান্ড এখন লোকালাইজেশন করতে আগ্রহী তাদের কাছে গুণমান ও দক্ষতার সমস্যা সমাধানের রাস্তা অপেক্ষাকৃত সহজ, কারণ এটি সংখ্যা ও যুক্তি দিয়ে বোঝা সম্ভব। নিজেদের লোকালাইজেশনের জন্য পার্টনার বাছার আগে তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা আছে কিনা তা যাচাই করা আবশ্যক, তাতে ব্র্যান্ডের চাহিদা ও পছন্দ অনুযায়ী পার্টনারের সঠিক সমাধান দিতে সুবিধা হবে।এই সব বিষয়গুলি বিবেচনা করলে দেখবেন, আঞ্চলিক ভাষায় আত্মপ্রকাশ করাটা যেকোনও ব্যবসার ক্ষেত্রে বেশি লাভজনক। শুধু খেয়াল রাখবেন, আপনার ব্র্যান্ড যেন সঠিক মানসিকতা নিয়ে এবং সঠিক পার্টনারের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেই এই কর্মযজ্ঞে নামে।

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *